banner-ad
lakshmipurtimes

একটি জীবনের গল্প

মধুমতি গ্রামের ময়না-মতি


১৫ মে ২০১৭ সোমবার, ০৬:০৭  পিএম

লক্ষ্মীপুর টাইমস

লক্ষ্মীপুর টাইমস অ - ..... অ+


মধুমতি গ্রামের ময়না-মতি

মধুমতি গ্রামে আমাদের চোট্ট একটি ঘর। এক প্রকোষ্ঠের স্বপ্নের ঠিকানা। আকাশের সব মেঘের রং সাদা-নীল। ক্লান্তিহীন ছুটে চলে মেঘের দোলা। সূর্যকে ঢেকে ছায়া দিয়ে শিতল করে রাখে আমাদের স্বপ্নকে। আমরা দু`জন দু`জনের অবিচ্ছেদ্য জীবনের অংশিদার। লাল দোপাট্টা শাড়ী পরা রংধনুর রঙ্গে একাকার সোনালী বিকাল। হৃদয়ে আমার প্রতিক্ষার প্রহর গুনা, হাতের কাজ তাও আমার জন্য, খাওয়ার আয়োজন আমার পচন্দ মত, আমাকে দেখাবে বলে কপালের লাল টিপ, সস্তা কাঁচের চুঁড়ির রিমিঝিমি শব্দ ছন্দের অনুভবে দোলাচল, আমার জন্য আমার নব বধূর প্রতিক্ষা। স্বামীর স্ত্রীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় আমাদের নুতন জীবন।

বিবাহের দিন আমার ঋন করা অর্থে মুক রক্ষার কেনাকাটা দিয়েই স্ত্রীর প্রতি দায় শোধ। রিক্সা করে নাইউর আনা আমার দারীদ্রতার চরম শাস্তি আমার স্ত্রীকে চাপিয়ে দিয়েছি। দুরুদরু বুকে হতভাগ্য চোখে তাকানোর চেষ্টা করে বুকে ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় হলো। স্ত্রীর মৃদু হাসিতে গোলাপের স্নিগ্ধতা আর চন্দিমার আলোর চাদর আমার ব্যর্থতাকে ঢেকে দিয়েছে। অনেক অসম্পুর্ন দায়কে আমার নব-বধু দায়মুক্ত করে দিয়েছে। অলংকার মেয়েদের কাঙ্খিত প্রত্যাশা। আমার নবাগত স্ত্রীর কোন অলংকার নেই বলে তার কোন দু্ঃখ নেই। স্ত্রী জানিয়ে দিলো স্বামীই আমার জীবনের মূল্যবান অলংকার।

আমার স্ত্রীর নাম ময়না। নামের সাথে জীবনের মিশে থাকা এক মোহনীয় শক্তি আমার জীবনকে জয় করে মধুমতি গ্রামকে আত্মিক করে নিয়েছে। ময়না আর মধুমতির একাকার মিলেমিশে বসবাস। দু`জনের প্রত্যাশার সীমানা খুব কাছে হওয়ায় দারীদ্রতা আমদেরকে আক্রমন করার সাহস পায় না। জীবনের জন্য ভালোবাসা খুব প্রয়োজন। ভালোবাসার জন্য প্রয়োজন দু`টি হৃদয়ের। আমাদের দু`টিই ছিলো। হৃদয় আর ভালোবাসায় পরিশোধিত জীবনেকে কোন অপ্রাপ্তি স্পর্শ করতে পারে না। আমার সান্নিধ্যে ময়না ময়নাপাখির মত বলতে থাকে জীবনের অফুরন্ত জয়গান। কোন ক্লান্তি নেই, ভালোবাসার যেন কোন সীমানা নেই।

ময়নাকে আমি আগলে রাখি,ঘরের কাজে আমার অংশগ্রহনে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। এক জনের ভার অন্য জন বহন করার মাঝে যে আনন্দ সেই আনন্দ অনুভব করে তৃপ্ত হই। দু`জনের সুখ-দুখের যৌথ মালিকানাই আমাদের চোট্ট সংসার জীবন। ময়নার বাবা নাইউর নেওয়া ভূলেই গেছে।প্রতিবারই ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ ছিল ময়নারই। মৃদু হেসে বিদায় নিয়েছে সকলেই। আমাদের পৃথিবী খুব ছোট তার রং রুপে ব্যাপ্তির সীমানা অনেক বড়। মাসিক খরচের টাকা ময়নার কাছেই সঞ্চিত থাকে, যেন আমার যোগ্যতার আত্মসমর্পন। আমার সরল স্বীকারোক্তি দেখে ময়না আমাকে উন্মাদের মত ভালোবাসে। স্ত্রীদের উপর স্বামীদের নির্ভরশীলতা বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি করে।

কর্মস্থলে বাড়তি শ্রমে বকশিশের টাকায় ময়নার জন্য কেনা তার প্রিয় আইসক্রিম নিয়ে দ্রুত সাইকেল চালায়ে বাড়ীতে আসি। অনেক পথ দৌড়ে এসে ক্ষয়ে যাওয়া আইসক্রিম দেখে ময়না হেসে আত্মহারা কেননা আইসক্রিম এতক্ষনে ঠান্ডা তরল পানিতে পরিনত হয়েছে। নির্বাকে বেচারার মত দাঁড়িয়ে থেকে ময়নার হাঁসির কারন খুজতে থাকি। ময়না আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো এতেই আমি খুশি। আমার অশ্রুসিক্ত হলো নয়নের জলে, একটি আইসক্রিমের জন্য নয়, আমার ভালোবাসার ময়নাকে আনন্দিত করতে না পারার বেদনায়। আমার অশ্রুসজল ছোখের ভাষা পৃথিবীতে একজনই বুঝতে পারে সে হলো ময়না।

সংক্রান্তির মেলায় আমি আর ময়না হাত ধরাধরি করে উজাড় করে হেটেছি, অনেক কিছু কিনতে চেয়েছি। একটি বকুল ফু্লের মালা কিনে খোঁপায় পরিয়ে দিয়েছি এতেই ময়না খুশিতে টগবগ। কানে কানে বলেছে আমার আর কিছু চাইনা। দু`জনে ফুসকা খেয়েই মেলার সব আনন্দ সব লুফে নিয়েছি।পুরো মাসের বেতন অগ্রিম নিয়ে ময়নাকে একটি গ্রামিন চেকের শাড়ি কিনে দিয়েছি।ময়না জানালো এই উপহার সম্রাট শাহজাহানের তাজমহলের চেয়েও দামী। ময়নার হাতে টাকা থাকার কথা নয় আমাকে দশ টাকা দিয়ে একটি একটি পকেট চিরুনি কিনে দিয়েছে। ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ভালোবাসার মাঝে এত আনন্দ থাকে আমি আগে বুঝতে পারিনি

প্রস্ফুটিত ফুলের বাগানে কাঁটা থাকবে না তাহা হতে পারে না। দমকা হাওয়ার গরম উত্তাপ আমাদের ছোট্ট বাড়ীর উপর দিয়ে অনেকবার অতিক্রম করেছে। পাশের বাড়ীর জাপানী ভাবী এসে ময়নার সাথে অযাচিত গল্প শুনাতে চায়, তার স্বামী জাপান থাকে, অলংকার দিয়ে শরীর ঢেকে দিয়েছে, হাত খরচ ডলার করে পাঠায়,গতমাসে একা একা দার্জিলিং ঘুরে এসেছে, কত সুখ তাদের বাড়ীতে!এসব ময়নার শুনে কাজ নেই। ময়নার সাফ জবাব গরীবের এসব ভাবতে নেই। আমার স্বামী গতকাল একটি চমচম এনে নিজ হাতে খাওয়ায়ে দিয়েছে। তার হাত ধরে অর্ধেক আমি খেয়েছি বাকী অর্ধেক তাকে খাওয়ায়েছি এতটুকু সুখই আমাদের পৃথিবী। আমার অলংকারে কৃত্রিম সৌন্দর্য্যের চেয়েও আমার স্বামীর চোখে আমি বেশী সুন্দর, আমার স্বামীই আমাকে একথা বলেছে।

ময়নার দু`চোখ যেন জীবনান্দের বনলতা সেনের চোখ ভরা চোরাবালি। মায়াবী দোলনার মত এক গোছা চুল। হাত দু`টি আমাকে জড়িয়ে ধরার মাপেই তৈরী, মৃদুমন্দ ছন্দের তালে অপরুপ রুপের মহিমায় মহিমান্বিত। কপালে ভোরের সূর্যের মত লাল টিপ। কাজল কালো চোখের ছল করে থাকা অনুক্ষণ। টোল পড়া কপোলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সুরভীত সৌরভে ময়না ভালোবাসায় তৃষ্ণার্থ। আমার আঁকা কল্পনায় ময়না রুপ এরকমই। যে কোন পুরুষের চোখেই ময়না রুপের রানী। ময়নাকে দেখে সর্দার বাড়ীর কালু সর্দারের সুদর্শন ছেলের খুব পচন্দ হয়েছে। আমার অনুপস্থিতিতে ময়নাকে মূল্যবান উপহার দিতে চায়। একটি মেয়ের জীবনে এর চেয়ে বিরক্তকর প্রতিকূল আত্ম লড়াই আর কিছু নেই।

কালু সরদারের ছেলের ভয়ে গ্রাম আতংকিত থাকে। শৌর্যবীর্য আর অর্থের দাপলে কালুর ছেলে লালু যাহা চায় তাই হতে হয়। ময়নাকে হুমকি দিয়েছে একথা জানাজানি হলে তার স্বামীর জীবন বিপন্ন হতে পারে। ময়নার যৌবনের দৃষ্ট্রিনন্দন রুপই আর ময়নার শত্রু। বিষাদে অন্ধকারাচ্ছন্ন মলিন ময়নার মুখ। কোথায় হারিয়ে গেল দরীদ্র জীবনের অকৃত্রিম ভালোবাসার সুখানূখূতির স্বপ্ননীল সুখের ঘর। আমার অনুমান সত্যি হলো ময়নার ব্যাথিত হৃদয়ের অংশিদার হলাম। শক্ত করে ঘুরে দাঁড়ালাম। ভালোবাসায় মহিমান্বিত জীবনে ভীরুতার কোন স্থান নেই। বাঁচলে দু`জন, হারলেও দু`জন। ময়নার ভালোবাসার শক্তিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তি।

অপশক্তির মুখোমুখি দাড়াঁয়ে লালুকে জানিয়ে দিলাম এমন কোন শক্তি নেই ময়নার আইব্রুতে আঘাত হানতে পারে। দরীদ্রতা কোন মানুষের অযোগ্যতার জন্য যথেষ্ট নয়। আইন, পুলিশ, আদালত থাকতে লালুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিনা যুদ্ধেই প্রতিপক্ষের পরাজয়। ময়নার ভালোবাসার জয় আমাকে বিজয়ী করে দিয়েছে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার যৌথ লড়াইয়ে আমরা বিজয়ী। ময়নার জীবনে আমিই তার স্বপ্নের পুরুষ। আমাদের ছোট্ট স্বপ্নের বুনিয়াদ আমাদের দাম্পত্য জীবনের স্বর্গের হাতছানি। কলহ বিবাদহীন সুখের দরীদ্র জীবন বিষাদময় ধনী জীবনের চেয়েও মাধুর্যমন্ডিত।

জগতে আমার নিকট-আত্মিয় কেউ ছিলোনা। সামুদ্রিক জলোচ্ছাসে ভেসে গেছে আপনজন। মধুমতি গ্রামে আমার ক্রয় করা চোট্ট ঠিকানা। নিজ হাতে গড়া ময়না আর আমার সংসার। মহজনের গদি ঘরে আমার চাকুরী। মধুমতি গ্রামের সব সুখ আমার ঘরে বাসা বেঁধেছে। ময়নার মেহেদী রঙ্গের রাঙানো হাতে রাঙ্গিয়ে দিয়েছে আমার মন। আমাদের চোট্ট নিড় পৃথিবীর হাতছানি। সুখের রাজ্যে ময়নাই রানী। আমার প্রেমের জগতে ময়নাই মমতাজ আমিই শাহজাহান। আমাদের সাম্রাজ্য নেই, নেই কোন অট্টালিকা, পৃথিবীর কারুকার্যখচিত সুরম্য অট্টালিকার চেয়েও ময়নার সুখের-বাসর আমার কাছে দামী। আমার নাম মতি। মধুমতি গ্রামে স্বপ্নিল সুখের ঠিকানায় বাস করি আমরা ময়না-মতি। এই ঠিকানায় আপনাদের দাওয়াত।

এড. মিজানুর রহমান
জজ, কোর্ট, লক্ষীপুর।
01712530834

আপনার মন্তব্য লিখুন:

লাইফস্টাইল এর সর্বশেষ



অন্যান্য বিভাগ

-->