banner-ad
lakshmipurtimes

ইরাকের দুঃসহ স্মৃতিঃ ফিরলেন ৭ বাংলাদেশি


ডিসেম্বর ৩, ২০১৫, ১২:২৬ পিএম

অনলাইন ডেস্ক

লক্ষ্মীপুর টাইমস অ - ..... অ+


ইরাকের দুঃসহ স্মৃতিঃ ফিরলেন ৭ বাংলাদেশি

প্রতিনিয়ত মারধর, মেরে ফেলার হুমকি, অসুস্থ হলে বিশ্রামেরও সুযোগ নেই। পিপাসায় বুক ফেটে গেলেও সময়মতো পানি মেলেনি। এমনকি হাত থেকে পানির পাত্র কেড়ে নিয়ে তা ফেলে দেয়া হয়েছে। সারা দিন কাজ করে ক্লান্ত শরীরেও ঘুমানোর সুযোগ হয়নি অনেক সময়। পুলিশ এসে আচমকায় ঘুম থেকে ডেকে নানাভাবে হয়রানি করেছে। গভীর রাতেও মারধরের শিকার হতে হয়েছে। প্রতারণার শিকার হয়ে ইরাকে যাওয়া আলোচিত সেই ১৮০ জনের ৭ জন দেশে ফিরে এভাবেই বর্ণনা করেন তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কাহিনী।

এর আগে ৫ দফায় দেশে ফেরেন আরও ৩৪ জন। বাকিরা এখনও সেখানে একই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ফিরে আসা বাংলাদেশিরা। এছাড়া নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে টর্চার সেল এবং কর্মস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন ১৪ বাংলাদেশি। এর মধ্যে একজন দেশে ফিরতে পারলেও বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানা যায়নি আজও। পরিবারের কাছেও কোনো তথ্য নেই। ফিরে আসা শ্রমিকরা জানান, ওই ১৪ জনকে তারা পালিয়ে যেতে দেখেননি। তাদের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে কাউকে কাউকে গুম করা হয়েছে। আদৌ তারা বেঁচে আছেন কি না সে ব্যাপারেও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। সোমবার সকালে অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে এই ৭ জন। রোববার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফ্লাইটটি বাগদাদ বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে শারজাহ হয়ে ঢাকায় পৌঁছে।

 ফিরে আসা ওই ৭ জন হলেন মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের জিনারুল, একই উপজেলার সাহারবাড়ী গ্রামের রাজন, মেহেরপুর সদর উপজেলার ট্যাঙার মাঠ গ্রামের আবদুল হালিম, যশোর ঝিকরগাছা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের মজুল হক, আবুল হোসেন, সুনামগঞ্জ বেড়িগাঁও গ্রামের হাসান আলী, মোহন। মজুল জানান, তিনি কাতার যাওয়ার উদ্দেশে ঢাকার একটি এজেন্সিকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তবে কেউ কেউ সাড়ে ৪ লাখ টাকাও দেন। কিন্তু প্রতারণার ফাঁদে ফেলে গত বছর ২২শে মে তাদের ইরাক নিয়ে যায়। এর আগের দিন ঢাকায় এনে তাদের জড়ো করে। দিনভর অফিসে অপেক্ষা করিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তড়িঘড়ি করে বলে ইরাকে ভালো একটি সুযোগ এসেছে। তাই কাতার না নিয়ে তাদের ইরাক পাঠানো হচ্ছে। সেখানে মোটা বেতনের কথাও উল্লেখ করে এজেন্সির হিমু নামে এক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে বলে সবাইকে একটি কাগজ ধরিয়ে দেয়। কিন্তু বিদেশ গিয়ে ভালো বেতনে কাজ করবেন, তাছাড়া এজেন্সির ভাষ্য মতে, এই সুযোগ শেষ হয়ে গেলে আর বিদেশ যেতে পারবেন না- এই চিন্তা করে তারা বিমানে ওঠেন। কিন্তু সে দেশে যাওয়ার কিছুুদিন পর তারা জানতে পারেন তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। সেখানে কোন কাজ নেই তাদের। ফিরে আসা শ্রমিকরা জানান, নাজ্জাবের এয়ারপোর্ট থেকে হায়দার, হালিম নামে দুই ইরাকি তাদের রিসিভ করে মরুভূমি এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে তারকাটার বাউন্ডারি দেয়া এলাকায় একটি কক্ষে রাখা হয়। সেই এলাকায় কার্মক্ষেত্রের কোন চিহ্ন ছিল না। ৪-৫ দিন অতিবাহিত হলেও কোনো কাজ না দেয়ায় সন্দেহ হয় তাদের। ২-৩ দিন ভালো খাবার দিলেও এরপর থেকে নিয়মিত খাবার কোন দিতো না। তাদের যে কক্ষে রাখা হয় সেখানে ২৫-৩০ জনের মতো থাকার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পর্যায়ক্রমে ১৮০ জন বাংলাদেশি সেখানে পৌঁছলে তাদের সবাইকে ওই কক্ষেই রাখা হয়। সেখানে ছিল না কোন বিদ্যুৎ, মরুভূমির প্রচণ্ড গরম। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। মোবইল ফোন, সিমকার্ড কেড়ে নেয়া হয়। ৬ জন দারোয়ান সার্বক্ষণিকভাবে সশস্ত্র অবস্থায় পাহারায় থাকতো। রোজার সময় সারা দিন রোজা থাকার পর ১৮০ জনের জন্য ইফতারিতে ২ প্যাকেট খেজুর এবং গরম পানি। তারা বলেন, তাদের পাহারায় যারা থাকতেন তারা পানি ঠাণ্ডা করে খেলেও আমাদের সে ব্যবস্থা ছিল না। বেশির ভাগ সময়ই শুকনা রুটি এবং টয়লেটের পাইপের পানি খেতে হতো। এরই মধ্যে তাদের সঙ্গে যাওয়া ইঞ্জিনিয়ার ফরিদ, এখলাছ, শফিক, রায়হান, সোহেল, আল আমিন তাদের থেকে পৃথক হয়ে যান। তারা এজেন্সির লোক হয়ে কাজ করতে থাকেন। নিজেরা বাজার করতেন। নিজেরা ভালো খাবার খেলেও বাকিদের দিতেন নিম্নমানের খাবার। দু-একবার দূতাবাসের লোকজন গেলেও তাদের ওপর নির্যাতন কমেনি। এমনকি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সামনেই কোম্পানির লোকজন এবং ইরাকিরা নির্যাতন করেছে। খাদ্যের অভাবে তারা দুর্বল হয়ে পড়লে জানতে পারেন রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু সব নিয়ন্ত্রণ করতেন ফরিদসহ ওই ৬ জন। ফলে তারা ভালো খেলেও বাকিরা এক প্রকার না খেয়েই দিন কাটাতেন। এই অবস্থায় ৫ মাস চলার পর এজেন্সির মালিক যান। তিনি ১ মাসের মধ্যে কাজ দেয়ার আশ্বাস দেন। এমনকি ওই সময় তাদের পরিবারকে তিন মাসের বেতন দেয়ার কথাও জানতে পারেন। কিন্তু চলে আসার পর আর কোন খোঁজ-খবর নেননি।

 অবশেষে নানা অমানুষিক নির্যাতনের ৮ মাস পর তাদের বাগদাদের আল দিয়া কোম্পানিতে কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়। কিন্তু তখন তাদের সবাই এতটাই দুর্বল এবং ভীত ছিলেন যে কেউই কাজের জন্য রাজি হননি। তারা সবাই দেশে ফেরার কথা বলেন। পরে তাদের কক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ৭-৮ দিন পর ইরাকি ওই কোম্পানির মালিকের ভাই আব্বাস রাত ১২টার দিকে ৭-৮ জনকে আলাদা করে রড, পাইপ দিয়ে বেধড়ক মারপিট করে। বুটের জুতা দিয়ে লাথি মারতে থাকে। ভয়ে পরের দিন সবাই কাজে যোগ দেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রেও তাদের ওপর চলতে থাকে অমানুষিক নির্যাতন। জোর করে ওভার টাইম করানো হয়। রাজি না হলে বেধড়ক মারধর করে। কাজের সময় পানি খেতে গেলে হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়। এমনকি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেও নির্যাতন চলে। মারধরের ভয়ে ওই অবস্থাতেই কাজে যোগ দেন। কিন্তু কোনো না কোনো কারণে নির্যাতন চলেই। ভুক্তভোগীরা বলেন, ১ মাস কাজ করার পর আকামা বাবদ বেতন কেটে নেয়। এছাড়া বেতনের টাকা ফরিদ নিয়ন্ত্রণ করতো। তাই বাড়িতে পুরো টাকা পাঠাইনি কখনও। কাগজপত্রও করে দেয়নি। তাই বাধ্য হয়ে নির্যাতন সত্ত্বেও বাড়ি ফেরার জন্য বলতে থাকি।

 তাছাড়া পরিবার মামলা, মানবাধিকার কমিশনে এবং মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেয়ায় বাড়ি পাঠিয়ে দিতে তারা রাজি হয়েছে। কিন্তু এজন্য কাজ করিয়ে ওই টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেয়। একেবারে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের। ফিরে আসা শ্রমিকরা জানান, নাজ্জাবের  থেকে সজল, মিনারুল, হেলাল, হুমায়ুন, মকবুল, আরিফুল, ইমরান, শরিফুল নিখোঁজ হয়েছেন। আজও তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। একই অবস্থা কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হওয়া বাদল, আমির, জয়নালেরও। তবে ইঞ্জিনিয়ার সিদ্দিক পালিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ফিরে আসা বাংলাদেশিরা বলেন, এখনও যারা সেখানে কাজ করছেন তারাও একই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তারাও বাড়ি ফেরার জন্য উদ্গ্রীব।

আপনার মন্তব্য লিখুন:



অন্যান্য বিভাগ