banner-ad
lakshmipurtimes

মাদকের করাল গ্রাস থেকে জাতি মুক্তি চায়


জুন ২৬, ২০১৮, ০৩:৫৬ পিএম

জহির উদ্দিন

লক্ষ্মীপুর টাইমস অ - ..... অ+


মাদকের করাল গ্রাস থেকে জাতি মুক্তি চায়

নেশা করার প্রবণতা বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসলেও সাম্প্রতিককালে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একটা জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য একটা মাদকই যথেষ্ট, আর কিছু লাগে না। মাদকাসক্তি এমন একটি দুর্বার নেশা, যাতে একবার অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তা পরিত্যাগ করা অতি দুরুহ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি কীভাবে ধ্বংসের অন্ধকারাচ্ছন্ন পথে এগিয়ে চলে তা সে নিজেও বুঝতে পারে না। মাদকে অভ্যস্ত ব্যক্তি শুধু নিজের ধ্বংসই টেনে আনে না, জাতীয় জীবনকে এক ভয়াবহ পরিণামের দিকে ঠেলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ)- এর মতে “মাদকাসক্তি হচ্ছে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর এমন এক সাময়িক বা নিয়মিত নেশা যা উপর্যুপরি মাদকদ্রব্য (অশোধিত বা শোধিত) গ্রহণের ফলে সৃষ্টি হয়।” বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৮৯ মোতাবেক মাদকাসক্ত বলতে দৈহিক বা মানসিকভাবে মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যবহারকারী ব্যক্তিকে বোঝায়। মাদকের নেশা খুব দ্রুত মানুষকে আসক্ত করে, আর এই আসক্তির আকর্ষণ শক্তি এত তীব্র যে, একবার যাকে স্পর্শ করে তার পক্ষে আবার পূর্বের সহজ জীবনে ফিরে আসা দুষ্কর। নারকোটিক ড্রাগ এক জাতীয় মাদকদ্রব্য। হেরোইন, ব্রাউনসুগার, এল-এস-ডি, ম্ম্যাক প্রভৃতি নানা রকম এর নাম। মানুষের নেশার জন্যে রয়েছে আরো অনেক ড্রাগ। যেমন গাঁজা, আফিম, বাঙলা মদ, ফেনসিডিল, তাড়ি, চরস, ভাং, প্যাথেড্রিন, মরফিন, হাসিস, কোকেন, ইয়াবা ছাড়াও রয়েছে নানা রকম ঘুমের ট্যাবলেট। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মাদক ব্যবসার কাঁচা টাকার লোভে এবং যুদ্ধের সময় সেনাদের চাঙ্গা রাখার জন্য রাষ্ট্রের শাসকরা পরিকল্পিত ভাবে মাদক ব্যবসার অনুমতি এবং তার ব্যবহারকে বৈধতা দিয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ অপিয়াম নিলে দিনের পর দিন ঘুম ব্যতীত সমানভাবে সৈনিকদের চলনশক্তি বজায় থাকে। অধিকন্তু পিল গ্রহণকারী সেনাদের মনে ভয়ভীতি একেবারে কাজ করে না। উনিশ শতকের শুরু থেকে ব্রিটিশ সরকার তার বৃহত্তম উপনিবেশ ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তানে পরিকল্পিতভাবে মাদকের চাষ করেছে এবং সর্বনাশা এই দ্রব্যটি সারা বিশ্বে রপ্ততানি করেছে। ইতিহাসের সূত্র ধরে পুরো বিশ্বই আজ মাদকে আক্রান্ত। পৃথিবীর শতাধিক দেশের ৫০-৬০ কোটি মানুষ মাদকে আসক্ত বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এক সরকারি জরিপে জানা গেছে যে, সমগ্র দেশে ১৮ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি। যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইয়াবা সেবনকারী। হতাশা, ব্যর্থতা, বেকারত্ব, বিষাদ যখন ব্যক্তি জীবনকে গ্রাস করে তখন মানুষ নেশার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। ক্রমে এ নেশা অভ্যস্ত হয়ে পড়লে, তখন প্রয়োজনের তাগিদেই ব্যক্তি নেশা করে থাকে। অনেকেই কৌতুহল বশত নেশা করে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তির জন্য জীবনের অস্তিরতা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, অবৈধ টাকার ছড়াছড়ি, সঙ্গদোষ প্রভৃতি কারণ বিদ্যমান। মাদকাসক্তি তরুণ সমাজে অধিকতর ব্যাপকতা লাভ করেছে।
যার ফলে সমাজে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, পতিতালয়ে গমন, পারিবারিক ভাঙ্গন, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন প্রভৃতি সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। মাদকদ্রব্যের অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসহ নৈতিক অধঃপতন ঘটে যা সামাজিক ও ধর্র্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটায়। মাদকাসক্তি সমস্যা আমাদের দেশের শিক্ষার ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কারণ মাদকাসক্তির প্রভাবে অনেক মেধাবী ও ভালো ছাত্র-ছাত্রী মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে তাদের সুস্থ ও সুন্দর শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটিয়ে ক্রমে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যারা ফিরে আসছে তারাও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারছে না। সুতরাং দেখা যায়, মাদকাসক্তি সমস্যা আমাদের দেশের শিক্ষার ওপরও মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তাই মাদকের এই করাল গ্রাস থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের গৃহীত অভিযান এবং জিরো টলারেন্স নীতি অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। তবে এ অভিযান অবশ্যই চালু রাখতে হবে। বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সর্ব প্রথম ‘মাদক প্রতিরোধ’ আন্দোলনে অবতীর্ণ হয়। এর পর ১৯৮৭ সালে বিশ্বের ২৩টি রাষ্ট্র ‘মাদক প্রতিরোধ আন্দোলনে’ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগদান করে। মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশও সোচ্চার হয়ে উঠেছে। কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইরানে ৩১ জনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কয়েক বছর পূর্বে লস এঞ্জেলসে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর লোকেরা ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের ২০ টন কোকেন আটক করে। আবার ১৯৩৬ সালে বিপজ্জনক মাদক দ্রব্যের অবৈধ পাচার রোধ সংক্রান্ত কনভেনশন প্রণয়নের পর হতে লীগ অব নেশনস ও পরবর্তীকালে জাতিসংঘ এ ব্যাপারে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যেন কোনো রাষ্ট্রই আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে মাদকের অবৈধ পাচারকারীদের শাস্তি দান এড়িয়ে যেতে না পারে। বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে ১৯৬১ সালের মাদকদ্রব্যের ওপর একক কনভেনশন অংশীদারিত্ব লাভ করে এবং চেতনানাশক দ্রব্য কনভেনশন ১৯৭১ এবং ১৯৮৮ সালের মাদক দ্রব্য ও চেতনানাশক দ্রব্যের অবৈধ পাচার রোধে জাতিসংঘ কনভেনশনে এবং সার্ক কনভেনশন ১৯৯০- তে স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ২৬ জুন পালন করে। এছাড়া মাদক দ্রব্যের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য দেশব্যাপী মাঝে মাঝে র‌্যালি, সেমিনার ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সাল থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে স্থাপিত মাদক চিকিৎসা কেন্দ্র কাজ করছে। খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে আরোও তিনটি মাদক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। আজ সারা পৃথিবী জুড়ে মাদকাসক্তির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ ভয়াবহ সমস্যা জাতিকে এক সীমাহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকের ব্যাপক বিস্তারের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজে বর্তমানে অত্যাধুনিক নেশার বিস্তার ঘটেছে। এতে শুধু সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সমগ্র জাতিই এক ভয়াবহ পরিণামের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা সবাই সুখ চাই, শান্তি চাই, স্বস্তি চাই, চাই মুক্ত দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে উদার আকাশ আর সবুজ বন-বনানীর অপরূপ সৌন্দর্য সুষমা উপভোগ করতে। কিন্তু সর্বনাশা নেশা আমাদের সমস্ত কামনা-বাসনা, আশা-আকাক্সক্ষা সব উলট-পালট করে দিচ্ছে।

এক কথায়, আমাদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। সুতরাং এর কুফল বিবেচনা করে এর বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এর ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে যদিও সারাদেশে মাদক দ্রব্য প্রতিরোধ সম্পর্কে জনসচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। সে জন্য মাদকদ্রব্য সরবরাহ বন্ধ এবং প্রতিকারের জন্য কিছু পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এক. ইয়াবার একমাত্র প্রবেশ পথ এবং কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে কক্সবাজার। তাই পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার এবং সব গোয়েন্দা সংস্থাকে নিয়ে শুধু ইয়াবা প্রবেশ বন্ধ করার জন্য একটা বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এই টাস্কফোর্সকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার সুযোগ ও ক্ষমতা দিতে হবে। টাস্কফোর্স কর্তৃক কক্সবাজার কেন্দ্রিক সব মাদক ব্যবসায়ী চক্রকে যে কোনো মূল্যে গ্রেফতার এবং নিশ্চিত করতে হবে তারা যেন জামিন না পায়। দুই . মাদকের অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের বিচার প্রক্রিয়াকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে। তিন. মাদক ব্যবসায়ী ও গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। চার. মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও আমদানি নিষিদ্ধ করণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাঁচ. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠ্যসূচিতে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে। বিভিন্ন সভা, সমিতি, সেমিনার, মসজিদ আলোচনা ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যম গুলোতে প্রচারের মাধ্যমে মাদকের কুফল তুলে ধরতে হবে। মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। ষষ্ঠ. মাদকাসক্তদের প্রথমে তার পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনতে হবে, যাতে সে আর পুনরায় মাদক গ্রহণ করার সুযোগ না পায়। পরে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করার জন্য কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করে ¯েœহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ব্যক্তি পরিপূর্ণ ভাবে সুস্থ হয়ে তার হারানো ক্ষমতা ফিরে পায় এবং স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার জনিত সমস্যা আজ বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে  এ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য মাকদাসক্তি নিরাময় ও সরকারের প্রতিরোধ অভিযানে আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। এর পূর্বশর্ত হিসেবে ধুমপান ও মাদকবিরোধী অভিযানকে আরোও বেগবান করতে হবে। মনে রাখতে হবে জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল। জঙ্গি দমনের ধারাবাহিকতায় মাদক ব্যবসায়ী চক্র দমনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সফল হবে- এটাই দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে। কারণ জাতি আজ মাদকের এই ভয়ঙ্কর করাল গ্রাস থেকে মুক্তি চায়।

লেখক- জহির উদ্দিন, প্রভাষক (ব্যবস্থাপনা) ও প্রফেসর ইনচার্জ
প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর।

 

আপনার মন্তব্য লিখুন:



অন্যান্য বিভাগ