banner-ad
lakshmipurtimes

এই রাষ্ট্রে সুবোধ কে?


জুলাই ১০, ২০১৮, ০৩:২৮ পিএম

আরিফ চৌধুরী শুভ

লক্ষ্মীপুর টাইমস অ - ..... অ+


এই রাষ্ট্রে সুবোধ কে?

সুবোধ কি রাষ্ট্র, ব্যক্তি না কোন অদৃশ্য শক্তি? কেন বার বার আমরা সুবোধকে ডাকছি বিপদ দেখলে আর হতাশ হয়ে বলছি ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’। আবার আশা নিয়ে বলছি, সুবোধ তুই ঘুরে দাঁড়া, সময় এখন তোর’। এমন একটা রাষ্ট্রের মুখোমুখি আজ আমরা, যেখানে রাষ্ট্র আমাদের কাছে সুবোধ চরিত্রে অভিনীত, আমরা প্রতিপক্ষ ও আসামী!
রাষ্ট্রের চোখে সুবোধ মানে প্রতিবাদকারী, সরকারের সমালোচনাকারী ও অবক্ষয় দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাধীনতার যত স্তম্ভ। তাই বলে সুবোধের কি বেঁচে থাকার অধিকার নাই? সুবোধ কি ধর্ষিত ও দলিত হবে কুবোধের পদে? আর কুবোধ প্রশংসিত ও প্রমোশিত হচ্ছে পুরো রাষ্ট্রে। কাটাতারের বেড়ায় এই ব-ভূখন্ডে আজ কে সুবোধ, আর কে কুবোধ এটাই বোঝা মুশকিল। কমবেশি কুবোধকে চিনতে পারলেও সুবোধ সহজে ধরা দেয় না। সুবোধ জেগে ওঠে জনতার কণ্ঠে, ভ্যাটের আন্দোলনে, কোটার আন্দোলনে, ধর্ষণের প্রতিবাদে এবং মানবতার পাশে। এই সুবোধরাই যেন একখন্ড বাংলাদেশ বনে যায়।
সরকার আজ যতই ভালো কাজ করুক, কিন্তু তার অনুসারী ও পুলিশকে দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে দমন নিপীড়নে ব্যবহার করে দেশের মানুষকে দিনকে দিন প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আমরা আচার-আচরণে যতটা নমনীয় দেখেছি, কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের ৯ বছর পার না হতেই সরকার নিজের অবস্থান থেকে সরে গেছে যোজন যোজন দূরে। এই দূরুত্ব ক্রমশই বাড়ছে।
দিন যত যায় আমরা শুধু সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা আর কঠোরতাই দেখছি। নির্বাচনবিহীন যেকোন সরকার যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যে সর্বাঙ্গে আশীর্বাদ নয়, তার উদাহরণ বর্তমান পরিস্থিতি দেখলেই অনুমেয়। আশা করি সরকারও এটি অস্বীকার করতে পারবে না। সরকারের কিছু কিছু ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দীর্ঘ ৯ বছরের সমস্ত উন্নয়নকে জনমনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ২০১৫ সালে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট আন্দোলন এবং ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণের সবচেয়ে বড় আন্দোলন। এত বড় শিক্ষা অধিকার আন্দোলন বাংলাদেশ আর কখনো দেখেনি। কিন্তু এই দুই আন্দোলনকেই সরকার ছাত্রলীগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু চেষ্টা করেছে এটাতো সত্যি।
সরকারের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যখন রাজপথে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষ অবস্থান নেয়, তখন তাকে অযৌক্তিক বলা যাবে না। সরকারের জন্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় হলো ভ্যাট আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারের দীর্ঘ সুনাম লুণ্ঠিত করেছে। কারণ জোর করে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট আর কোটার দৌরাত্ম। অতি উৎসুক ছাত্রলীগ সরকারকে খুশি করার জন্যে আক্রমণ করেছে দুই আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের উপর। কোটা নিয়ে শাহবাগে শিক্ষার্থীরা বার বার রক্তাক্ত হয়েছে। শাহবাগ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুলিশ ও ছাত্রলীগ দ্বারা। এটা অত্যন্ত ঘৃণার ও লজ্জার। এটা দিনের পর দিন চলতে থাকলে সরকারেরই বেশি ক্ষতি। সরকারও সেটি বোঝে। কিন্তু সরকার আন্তরিক না থাকলে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাবে কে এবং সেটি কীভাবে?
একাত্তরের আগে বাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র। কারণ পাকিস্তান সরকারের একগুয়েমি সিদ্ধান্ত, বহুমুখী বৈষম্য, শোষণ, অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারের মাত্রা এত বেশি করা হয়েছে সাধারণ মানুষের উপর, তখন পুরো বাংলার প্রায় ৯৮% মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ মনে করেছে। যেমনটি আজও অনেকেই মনে করছি বাংলাদেশকে। সেই আলোচনা আরো বহুমুখি ও অনেক দীর্ঘ। কিন্তু সেদিন বেঁচে থাকার জন্যে সবাই একত্রিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই যুদ্ধের অন্যতম কান্ডারী। কিন্তু আজ একজন বঙ্গবন্ধুর অভাবে আমরা দলিত হচ্ছি বঙ্গবন্ধুর বাংলায়। কোটা নামক অন্যায় মেধাবীদের পিছিয়ে দিচ্ছে অধিকার থেকে। আজ আমরা স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার সন্ধান করছি প্রতিটি অনিরাপদ মুহুর্তে। এটা কি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যেও আজ দুঃখের নয়?
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকার ও তার আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে যে আচরণ করছে, তা দেখে মুক্তিযুদ্ধের মর্মার্থতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে মনে। মনে হচ্ছে এদেশে আর কোন মুক্তিযোদ্ধা জীবিত নাই। যদি থাকতেন, তাহলে সরকারের এত অন্যায় সিদ্ধান্তে, ছাত্রলীগের এমন বর্রবোরিচিত কান্ডে শিক্ষার্থীদের সাথে মুক্তিযোদ্ধারাও রাজপথে থাকতেন। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বার বার এভাবে রাস্তায় পিটানোর প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধারা সোচ্চার হতেন। এসব দেখেও কোন স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধারা এখনো চুপ আছেন? মুক্তিযোদ্ধারা যদি সুবোধ না হতে পারেন তাহলে এই রাষ্ট্রে কে সুবোধ? কোন সুবোধেরা এই দেশ স্বাধীন করেছেন একাত্তরে?
প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, কিন্তু মেয়েদের গায়ে হাত তোলার সাহস ছাত্রলীগ কীভাবে পায়? দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের অপরাজনীতি শুধু শিক্ষার পরিবেশই নষ্ট করে না, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নেতৃত্ব যখন এদের কারো হাতেই আসে তখন বাংলাদেশের পথচলা নিয়ে আক্ষেপ করা ছাড়া উপায় থাকে না। প্রশ্ন হলো কোথাও যখন কোন আন্দোলন বা কোন দাবি ওঠে, তখন ছাত্রলীগ কি শুধু আন্দোলনকারীদের পিটিয়ে নিবৃত করার জন্যেই প্রস্তুত থাকে? এটাই কি ছাত্রলীগের কাজ?
যদি ছাত্রলীগের উপর উপরের নির্দেশ না থাকে, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এতবড় একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও প্রধানমন্ত্রী নিশ্চুপতা আমাদের আরো বেশি হতাশ করেছে। গতকালের ঘটনার জন্যে আমার দৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই দায়ী। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করেছে, কোটা বাতিলের নয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী পুরো কোটাই বাতিল করে দিলেন। কিন্তু তিনি নির্দেশ দেওয়ার পর যদি যথাসময়ে প্রজ্ঞাপন করা হতো, তাহলে শিক্ষার্থীদের  দ্বিতীয়বার রাজপথে ছাত্রলীগের দ্বারা মার খেতে হতো না। মেয়েরা নিগৃহের শিকার হতো না। সুতরাং লাখ লাখ শিক্ষার্থীর সাথে কোটা সংস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত যেই প্রতারণা তার জন্যে আমরা প্রধানমন্ত্রীকেই প্রথমে দুষবো।   
একাত্তরের স্বাধীনতার পরে এদেশের মানুষ শুধু বেঁচে থাকার স্বপ্নই দেখেনি, নিজেদের স্বনির্ভর জাতি হিসাবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্নও দেখেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি কোটা ব্যবস্থা মেধাবীদের সে পথ রোহিত করেছে। চারপাশে চাটুকারিতা আর তেলবাজের সংখ্যা এত পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে যে মেধাবীরা আজ রাস্তায় আন্দোলন করতে গেলেও নিগৃহের শিকার হচ্ছে।
আমাদের দৃষ্টিতে ভ্যাট আন্দোলন আর কোটা সংস্কারের আন্দোলনের তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ। তারা দাসত্ব, তেলবাজী আর গোলামীমুক্ত বাংলাদেশ চায়। তারা চায় মেধার প্রতিযোগিতা। তারা চায় একট অহিংস স্বাধীনতার পূর্ণ অর্থবহ বাংলাদেশ। তারাই ভালোবাসে মুক্তিযুদ্ধের সুবোধদের। তারাই বলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণ মর্যাদার কথা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী মানেই যদি হয় কুবোধ, দেশদ্রোহী ও বিপথগামী সন্তান, তাহলে এই দুঃখ আজ ও আগামীর বাংলাদেশের। এই সুখ জেগে থাকা সুবোধদের।
লেখক- উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন।

আপনার মন্তব্য লিখুন:



অন্যান্য বিভাগ