GoNes24

১৬ ডিসেম্বর , জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন


শরীফ আল হাসান | আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার, ১১:১৭  পিএম
১৬ ডিসেম্বর , জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন

বাঙ্গালি জাতির জীবনে ঘটে যাওয়ার অনেক ইতিহাসের মধ্যে যে ইতিহাস বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীকে মুক্তির সনদ প্রদান করেছিলো , তা মুক্তিযুদ্ধ । ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্টটি পৃথিবীর বুকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছিলো । দীর্ঘ ত্যাগ ,তিতিক্ষা ,রক্ত,অশ্রুর বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন ,আমাদের অহংকর।
কতশত বছর থেকে এ দেশের কৃষক সন্তানরা এই আশা বুকে নিয়ে যে নানান বিদ্রোহ ও সংগ্রাম করেছে ,আর সেই অনুপ্রেরণার- সুত্র ধরেই আসে একাত্তর ,মুক্তিযোদ্ধের সময়ের সেই দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার অতুলনীয় সুযোগ মেলে এই অঞ্চলের দুঃখী মানুষের। সেই সুযোগ সর্বোচ্চ ব্যাবহার করে তারা অর্জন করে স্বাধীন বাংলাদেশ  । এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম বলে তাদের তখনে বিভক্ত করা হয়নি ,ছিল না নৃতাত্ত্বিক বিচারের ও জনগোষ্ঠীর বিভাজন । কিন্তু পরবর্তীকালে তাদের সেই অবিভাজ্য পরিচয়ের ব্যত্যয় ঘটে ,১৯৮৮ সালে রাষ্টধর্মের নাম ও ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাসহ বাংলাদেশের স্থপতিদের হত্যা করার পরই শুরুহয় জাতির মৌল আকাক্ষাকে দুমড়ে- মুচড়ে ফেলে তাকে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক নির্মম প্রক্রিয়া । সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের ,বদলে যোগ করা হয় ,জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের ,কথাগুলো যেমন স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ । কিন্তু তাই বলে তা মুক্তির প্রতিশব্দ হতে পারেনা । স্বাধীন বাংলার জন্ম যেভাবে 
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে । জন্ম নেয় দুটি রাষ্ট । একটি ভারত ,অন্যটি পাকিস্তান । পাকিস্তান রাষ্টের ছিল দুটি অংশ- পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান । পশ্চিম পাকিস্তান ও পুর্ব পাকিস্তান দুটি অঞ্চলের মধ্যে ছিল , বিস্তর ফারাক । দুই অঞ্চলের ভাষা ,ইতিহাস ,ঐতিহ্য ,সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন । এই পার্থক্য সত্ত্বেও মুসলিম সংখ্যাগোষ্ঠ দুইটি অঞ্চল নিয়ে একটি রাষ্ট গঠিত হয় । এই রাষ্টকে পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ সেদিন স্বাগত জানিয়েছিল । এমনকি এর পক্ষে ভোট ও দিয়েছিল । কারন ইংরেজশাসিত  ভারতরাষ্ট্রে মুসলমানরা ,বিশেষত পূর্ব বাংলার পশ্চাৎপদ মুসলমানরা ছিল রাজনৈতিক ,অর্থনৈতিক ,চাকরি- বাকরি নানা দিক থেকে অবহেলিত । এই অবহেলা আর দরিদ্রতা থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে সেদিন পাকিস্তান রাষ্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল  ।

কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পর থেকেই দেখা  গেল ,পুর্ব বাংলার মানুষের ওই স্বপ্নই রয়ে যাচ্ছে । কারণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা শুরু থেকেই পাকিস্তান রাষ্টটিকে তাদের নিজেদের রাষ্ট বলে মনে করেছে । পুর্ব বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মানুষকে তারা ভালো চোখে দেখত না । পদ পদবি ,অর্থনৈতিক সুযোগ- সুবিধা সর্বক্ষেত্রে পুর্ব বাংলার মানুষ কে তারা বঞ্চিত করত। ঠিক ইংরেজশাসিত ভারতের মতো । ফলে ,পুর্ব বাংলার বাঙ্গালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচার অবিচার ,শোষনের শিকার হয়েছে দিনের পর দিন । কিন্তু কিছুকাল পর থেকেই পুর্ব বাংলার মানুষ এই অত্যাচার  অবিচার আর শোষন মেনে নিতে পারেনি । তারা বিভিন্ন সময় বাঙ্গালিদের উদ্বুদ্ধ হয়ে রুখে দিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের নানামুখী ষড়যন্ত্র । মুক্তিযুদ্ধ শুধু নয় মাসের ফল নয় রয়েছে দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাস । বহু রক্তস্নাত রাজপথ পাড়ি দিয়ে স্বাধীনতার স্বাদ আমাদের গ্রহন করতে হয়েছে ।


প্রথমে যে আঘাতটি আসে তা হলো ভাষার উপর । ভাষা হলো একটি সংস্কৃতি মেরুদণ্ড । তাকে ভেঙে দিলে ঐ জাতির মেরুদণ্ড অনেকাংশে ভেঙে পড়ে। ১৯৫২ সাল ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন ,জিন্নাহকে অনুকরন করে উর্দুকে পাকিস্তানি রাষ্টভাষা করার নতুন ঘোষণা প্রদান করেন। এর পর প্রতিবাদে ছাত্র সমাজ ধর্মঘট ,বিক্ষোভ চালাতে থাকে । পাকিস্তান সরকার ও এর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেয়। অবশেষে ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং ঐদিন রাষ্টভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সেদিন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করায় পুলিশ গুলি বর্ষণ করলে আবুল বরকত ,জাব্বার,রফিক ,সালামসহ আরো অনেকে শহিদ হন। এভাবে ভাষার মান রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। ভাষার মান রক্ষার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবল হয়ে ওঠে এবং স্বাধীনতার আকাক্ষা প্রবল আকার ধারন করে। ভাষা আন্দোলন হলো স্বাধীনতার প্রথম বপিত বীজ।


১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েও পশ্চিম পাকিস্তানদের ষড়যন্ত্র আর অবৈধ হস্তক্ষেপে মাত্র ৫৬ দিনে ক্ষমতা টিকে থাকতে পেরেছিল ,পুর্ব বাংলার নির্বাচিত সরকার । এটি পুর্ব বাংলার বাঙ্গালিদের মনের মধ্যে গভির ক্ষত তৈরি করে । এরপর ১৯৫৮ সালের সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করলে বাঙ্গালিরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে । ১৯৬২ সালে শিক্ষাকে সংকুচিত করলে দেখা দেয় তীব্র প্রতিবাদ । শোষন নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুকে জিঙ্গাসা করা হয়েছিল তিনি কেন ছয় দফা ঘোষণা করলেন ?  তিনি উত্তরে বলেছিলেন-_ স্বাধীনতার পথে যাওয়ার জন্য সাঁকো গড়ে দিলাম । অবস্থা ভালনা দেখে আইয়ুব খান ষড়যন্ত্রমুলকভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫জনকে ফাঁসিয়ে দিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রদোহীতার অভিযোগ এনে বিচারের পায়তারা করেন।  ১৯৭০ সালে রাজপথে গনঅভ্যুথ্থান থেকে ষড়যন্ত্রের মামলা প্রত্যাহারের দাবি ,৬ দফা দাবি এবং ছাত্র সমাজের ১১- দফা দাবির মুখে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্যহয়। ১৯৬৯ সালে গনঅভ্যুত্থান প্রবল হয় ওঠে আসাদের মুত্যুর মধ্য দিয়ে এক পর্যায়ে কৃষক ,শ্রমিক,ছাত্র,শিক্ষক ,সাধারণ মানুষ ,রাজপথে নেমে আসলে আইয়ুব খানের মসনদ নড়ে ওঠে। এবং পরবর্তীতে কঠিন আন্দোলন বেগতিক দেখে আইয়ুব খান ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্তে মুক্তি দেন  এবং নিজে পদত্যাগ করতে বাধ্যহন । ইয়াহিয়া খান উক্ত পদে আসীন হন এবং ঘোষনা করেন খুব তাড়াতাড়ি নির্বাচন হবে।
অবশেষে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর এক ব্যাক্তির এক ভোটের বিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় 
আর এতে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয় । কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ । জনগণ এইভাবে রায় দেওয়ার পরেও ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করেন । ইয়াহিয়া খান । নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ,আলাপ- আলোচনা ভান করে ৩ মার্চ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করেন। এমন পরিস্থিতিতে ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণনা ঘোষণা করেন। যেখানে দীর্ঘ  ২৩ বছরের শোষণ  শাসন,নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরেন । তিনি বলেন প্রত্যেক ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো  তোমাদের যা কিছু আছে,তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। তিনি আরো বলেন_  রক্ত যখন দিয়েছি ,রক্ত আরও দেবো ,এদেশের মানুষ কে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ্‌ । এভাবে বাঙ্গালির ভিতরে ভিতরে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে থাকে। তার পর ইতিহাসের ,কালরাত্রি ,হিসেবে অভিহিত করা ২৫ মার্চ বর্বরোচিত গনহত্যা । ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। এবং তা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হয় । এর পর আনুমানিক রাত ১টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়। 

মুক্তিযুদ্ধ 
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্বরণ- কালের বর্বরোচিত হত্যাযঞ্গ করে বাংলাদেশের মাটিতে  ।এ অবস্থায় বাঙ্গালি সেনা,পুলিশ,বর্ডার গার্ড ইত্যাদি বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে । এদিকে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করেন । এই সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান । এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ,প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রী নিয়ে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার । মুক্তিযুদ্ধের সেনা প্রধান ছিলেন কর্নেল ( অব ) আতাউল গনি ওসমানী । বাংলাদেশ কে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয় । এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানিদের সমর্থনে রাজাকার , আল- বদর , আল- শামস বাহিনীর মত আরো অনেক বাহিনী  । তারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে নানা অপকর্মের সাক্ষী হয়ে আছে। তাদের সহায়তা , তত্ত্বাবধানে ,মদদে আর অংশ গ্রহনে বাংলার মাটিতে সংগঠিত হয় গণহত্যা , ধর্ষণ , লুটতরাজ , ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধ । আর দেশকে মেধাশূন্য করার জন্য তারা করেছে বুদ্ধিজীবী নিধন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে তারা পরাজয় নিশ্চিত জেনে এই জঘন্যতম ঘটনাটি ঘটায়। এই সব শহিদ বুদ্ধিজীবীদের স্বরণে ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয় শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস। চীন , যুক্তরাষ্ট্রর মতো পরাশক্তি আমাদের  বিপক্ষে অবস্থান নিলেও ভারত , সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো অনেক বন্দ্ধুরাষ্ট্র আমাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ছে। ভারত আমাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পাকিস্তান বাহিনী ভারতের কিছু অংশে আক্রমণ করলে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে সৈন্য পাঠায় এবং যৌথ বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানিদের পরাজের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। এভাবে পাকিস্তানিদের ৯৩ হাজার সৈন্যসহ নিয়াজী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আত্মসমর্পণ করেন। এভাবেই ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জিত হয় আমাদের। স্বাধীনতা বাঙ্গালির জীবনে খুব সরলভাবে আসেনি । ৩০ লক্ষ প্রান , অসংখ্য মা-  বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এবং দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি আমাদের সার্বভৌমত্বের বড় উদাহরণ হিসাবে ধরা দিয়েছে ।

শরীফ আল হাসান
সভাপতি ,বাংলাদেশ ওইউ স্টুডেন্ট ফোরাম