• ঢাকা
  • বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭
Safe Diagnostic Center
আজ জাতীয় শোক দিবস

শেখ হাসিনা এবং ১৫ আগস্টের ছায়া


লক্ষ্মীপুর টাইমস | অনলাইন ডেক্স: প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২০, ১১:২৬ এএম শেখ হাসিনা এবং ১৫ আগস্টের ছায়া

[১৯৭৫–এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন ব্রাসেলসে। বেদনাভরা প্রবাস শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন ১৭ মে ১৯৮১। প্রত্যাবর্তনের সেই দিনটি থেকে মালেকা বেগম বেশ কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তখন তিনি সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। সেদিন তিনি ছিলেন বিমানবন্দরে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের রক্তমাখা বাড়িতে শেখ হাসিনার প্রথম প্রবেশের দিন তিনিও ছিলেন সঙ্গী। মিলিত হয়েছেন একাধিক সাক্ষাৎকারে। সেসব লেখার একটি গ্রন্থনা।]

 

সেদিন রোববার, ১৭ মে ১৯৮১। রাজপথে নেমেছিল মানুষের ঢল। পথের দুই ধারে মানুষের মিছিল, পথে ট্রাক, গাড়ি, হোন্ডার সারিবদ্ধ শোভাযাত্রা। পথের মানুষ আগেই জানে, শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন পর ঢাকায় আসছেন। বলাবলি চলছিল, ভালোই হয়েছে, রোববার অবসরের দিন, সময়টাও ভালো, বিকেলে শেরেবাংলার জনসভায় যাওয়া যাবে। রিকশাযাত্রীদের কথোপকথনে রিকশাওয়ালাও যোগ দেন, ‘দেইখ্যা আসেন কুর্মিটোলা এয়ারপোর্ট, শেখের বেটির লাগি কাতারে কাতারে মানুষ জমছে সকাল থাইক্যা। শেখ মুজিবুর যেই দিন ফিরছিল যুদ্ধের পর, এমুন মানুষ সেই দিনও হয় নাই।’
 

সত্যি তাই। তেজগাঁও বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে পথে দেখেছি, দুই ধারের বাড়ির কার্নিশে, ছাদে, দোকানে, ফুটপাতে মানুষ নির্নিমেষ চেয়ে ছিল ট্রাকগাড়ির শোভাযাত্রার দিকে। বিমানবন্দর এত দূর শহরাঞ্চল থেকে যে মানুষ ট্রাকগাড়ির শরণাপন্ন না হয়ে পারেনি। পথের মোড়ে মোড়ে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আহাজারি, ‘কী দ্যাখতে আইল শেখের মাইয়া, মা নাই, বাপ নাই, ভাইও নাই। আহা রে ক্যামুনে জানি জাগব ওর পরানে।’ কেঁদেছেন অনেকেই। কণ্ঠে স্লোগানের মর্মবিদারী ভাষা।
 

বিমানবন্দরের কাছাকাছি অপেক্ষমাণ জনতার কোঁচড়ে মুড়ি-চিড়ার স্পষ্ট আভাস দেখা যাচ্ছিল। দূর থেকে যাত্রা করে এঁরা এসেছেন। সবার চোখ রানওয়ের দিকে। আসমানের অবস্থা দুই দিন ধরেই খারাপ যাচ্ছে। কী জানি কেমন যাবে আজকের দিন। কালো মেঘ জমছে। বিমানবন্দর ছেয়ে গেছে গাড়ি আর মানুষে। ভিআইপি লাউঞ্জে ঢোকার গেট, গেটের ওপর ছাদ, লোকে লোকারণ্য। মানুষের চিৎকার, কথা, ঠেলাধাক্কা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে শেখ হাসিনার আগমনবার্তা।
 

ফুলের ঝাঁকা হাতে এক স্বেচ্ছাসেবক নিরাপত্তারক্ষীর ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে না পারায় উত্তেজিত, অথচ এত বড় কাজটির জন্য রোমাঞ্চিতও বটে। শেষে ফুলের ঝাঁকাটি লোকের হাতে হাতে গেটের ওপারে চলে গেল। সেখানে নেতারা অপেক্ষমাণ শেখ হাসিনার বিমানাবতরণের জন্য সাংবাদিক, আলোকচিত্রশিল্পীরা দুর্লভ কথা আর মুহূর্তটিকে কাগজ-কলম-ক্যামেরায় বন্দী করবেন বলে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিমান দেখেই পুলিশ, আনসারের প্রতিরোধ ভিঙিয়ে জনতা বানের পানির মতো ঢুকে গেল রানওয়েতে। বারকয়েক এমনি আসা–যাওয়ার মধ্যে শেখ হাসিনা এসে নামলেন জনসমুদ্রে। কান্না–হাসির দোল-দোলানো এ কোন মিলনোন্মুখ দৃশ্য।
 

শত–সহস্র কণ্ঠের অভিবাদন নিতে নিতে, হলুদ ফুলের মালা গলায়, দুই হাত উত্তোলিত করে, বন্ধু-স্বজন পরিবেষ্টিত হয়ে শেখ হাসিনা যখন চলে গেলেন বিমানবন্দর ছেড়ে, তখন জনতার পদভারে প্রকম্পিত সমগ্র এলাকাজুড়ে এল হর্ষধ্বনি। শেখ হাসিনার অশ্রু ঝরতে না–ঝরতেই তাঁর প্রতি সমবেদনায় বাংলার প্রান্তরজুড়ে নেমে এল অঝোর বারিধারা।
 

আমি কেন বেঁচে রইলাম, বলতে পারেন?
আমি কেন বেঁচে রইলাম, বলতে পারেন? সবার সঙ্গে আমিও কেন শেষ হয়ে গেলাম না? বলছিলেন শেখ হাসিনা। বহু কান্না কেঁদেছেন, ১০ দিন ধরে শুধুই মা–বাবা, ভাই, আত্মীয়স্বজনের কথা মনে পড়েছে। জনসংবর্ধনার উষ্ণ আত্মীয়তায় বাবার জন্য শোক আরও বেড়েছে। টুঙ্গিপাড়ায় বাবার কবরের পাশে বারবার সংজ্ঞা হারিয়ে জ্বরতপ্ত শরীরে শেখ হাসিনা কেবল ভেবেছেন, ‘আমি কেন বেঁচে থাকলাম?’ পরক্ষণেই মেয়ে পুতুলকে বুকে জড়িয়ে কেঁদেছেন অজস্রধারায়। স্বামী ও ছেলে জয়কে এই শোকাকুল অবস্থায় কাছে পেলে হয়তো ভার লাঘব হতো, হয়তো হতো না।
 

অনেক বর্ষণের পর কিছুটা শান্ত তাঁর দুই চোখে এখন নেমে আসছে ক্লান্তি, অপরিসীম ক্লান্তি। শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ঠিকানা জোগাড় করে ২৮ মে ঠিক বেলা একটায় যখন লালমাটিয়ার বাসায় গেলাম, তখন শেখ হাসিনা তৈরি হয়েছেন শেখ মনির নাবালক দুই ছেলে পরশ আর তাপসকে দেখতে যাবেন বলে। তাঁর সোনালি ফ্রেমের চশমার কাচে ঝিলিক দিয়ে উঠেই মিলিয়ে গেল পুরোনো পরিচয়ের ঘনিষ্ঠ হাসি। শেখ হাসিনা স্বামীর চাকরিস্থলে চলে গিয়েছিলেন ১৫ আগস্টের মাত্র কয়েক দিন আগে। জয়কে কিছুতেই নানা শেখ মুজিব ছাড়তে চাননি। কিন্তু শেখ হাসিনাও ছেড়ে যেতে চাননি জয়কে। এমনই টানাপোড়েনের মধ্যে জয়কে নিয়ে পাড়ি জমালেন বিদেশে। ও জন্যই তো জয় বেঁচে গেল। নয়তো শেখ হাসিনার জন্য অপেক্ষা করত আরও মর্মান্তিক শোক।
 

শেখ হাসিনা বললেন, ‘কত দিন পর দেখা সেই দিনগুলো মনে পড়ে গেল আপনাকে দেখে। কী বলব আর বলুন, আমি কেন বেঁচে রইলাম, বলতে পারেন? সবার সঙ্গে আমিও কেন শেষ হয়ে গেলাম না?’
 

তিনি আরও বললেন, ‘১৫ আগস্টের পর সবাইকে হারিয়ে আমার সব অনুভূতি মরে গেছে। সব হারানোর পর ঢাকা শহরে এখন শুধু কবর আর কবর। যাদের বুকে মাথা রেখে দুই দণ্ড শান্তি পেতে পারতাম, তাদের আর দেখতে পাব না এই জীবনে, ভাবলেও যে আমার বুক ফেটে যায়। বলেন আমি আর কী বলতে পারি?’
 

দেশের সর্ববৃহৎ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ আমার অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর এখন দেওয়া সম্ভব নয় বলে খুব নরম গলায় ক্লান্ত সুরে অনুরোধ জানালেন পরে একবার যেতে। তিনি দেশে ফিরে আসার পর এখনো পার্টির মিটিং হয়নি। দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই তিনি পারবেন সাক্ষাৎকার দিতে।
 

ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ৩২ নম্বর রোডের মাঝামাঝি এলেই শোনা যায় কোরআনখানির সুমধুর সুর। এই বাড়িটির মালিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নৃশংসভাবে সপরিবার নিহত হওয়ার ছয় বছর পর তাঁর জীবিত দুই উত্তরাধিকারীর একজন জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদকে সরকার থেকে বাড়িটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ছয় বছরে এ বাড়িটি পুলিশি পাহারায় ছিল।
 

গুলিবিদ্ধ বাড়ির দেয়ালগুলো নতুন করে রং করা হলেও ভেতর এখনো অপরিষ্কার। দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িটি এখন বন্ধ করা আছে, পতাকায় আচ্ছাদিত সিঁড়িটিতে শেখ হাসিনা আকুল হয়ে কেঁদেছেন, ‘বাবা, বাবা গো, তুমি কোথায়?’ এই সিঁড়িতে এখনো বঙ্গবন্ধুর রক্তের চিহ্ন বেশ স্পষ্ট।
 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিচের যে ঘরে বসতেন, পড়াশোনা করতেন, সে ঘরগুলো খোলা ছিল। এখনো বইয়ের আলমারিতে চাবি ঝুলছে, টেলিফোনটা অকেজো। কিন্তু তাঁর শেষ ছোঁয়ার চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে বই, টেবিল-চেয়ারে। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে উঠে যাওয়া যে সিঁড়িটি ঘরোয়া কাজে ব্যবহৃত হতো, সেটি দিয়েই এখন ওপরে যাওয়ার ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। আরেকটি কাঠের সিঁড়ি গাড়িবারান্দার কাছ দিয়ে ওপরে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো শেখ হাসিনা ওপরে উঠে সব ঘর দেখার মতো মানসিক শক্তি জোগাড় করে উঠতে পারছেন না।
 

ইতিমধ্যে এই বাড়িটি দর্শনীয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সবাই গভীর দুঃখ নিয়ে দেয়ালে বুলেটবিদ্ধ ছবি, তছনছ করে দেওয়া বাড়ির দরজা-জানালা, ছিন্নবিচ্ছিন্ন টেলিভিশনের তার—এসব দেখছিলেন, দেখছিলেন শেখ হাসিনার শোকবিহ্বল চলাচল, শরিক হচ্ছিলেন মিলাদে। বাড়িটি এখনো আগের মতোই রয়েছে।
 

বাড়িটির ওপরতলা শিগগিরই সাংবাদিকেরা দেখবেন। তারপর সাধারণ দর্শকের জন্য খুলে দেওয়া হবে ঘরগুলো। যাঁরা ইতিমধ্যে দেখেছেন, তাঁরা বলছেন, এ এক করুণ দৃশ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শয়নঘরে বাড়ির সদস্যদের একসঙ্গে পেয়ে সেখানেই তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল। দেয়ালে এখনো রক্তের চিহ্ন রয়ে গেছে। সব ঘরবাড়ি, দেয়াল, জিনিসপত্র নিষ্ঠুর আঘাতে জর্জরিত।
 

৩২ নম্বর রোডের বাড়িটির নিচতলায় বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা সাময়িকভাবে হয়েছে, ওপরতলা এখনো অন্ধকারে নিমজ্জিত। শেষবারের মতো বাড়িটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সেই সব উত্তাল দিনে ‘ভায়েরা আমার’ ডাকের স্মৃতিচারণা করতে করতে ফিরে এলাম।
 

সাক্ষাৎকার: ‘জিয়া যে পথে এসেছেন, সে পথে গেছেন’
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ ১৭ মে ঢাকায় আসার পর তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণের চেষ্টা নেওয়া হয়। কিন্তু পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রথম দেশে ফিরে এসে তিনি শোকে মুহ্যমান ছিলেন। মা–বাবা ও ভাইদেরসহ আত্মীয়স্বজনের কবর দেখতে দেখতে তাঁর মনের অবস্থা ছিল ব্যথিত, শোকবিদ্ধ। টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকায় আসার পরদিনই সচিত্র সন্ধানীর সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর বেদনাহত হৃদয় উন্মোচন করেছিলেন। বলেছিলেন, শোকের এই ধাক্কা সামলে উঠে তিনি সচিত্র সন্ধানীকে বিশেষ সাক্ষাৎকার দেবেন। গত ১১ জুন (১৯৮১ সাল) সচিত্র সন্ধানীর বিশেষ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ওয়াজেদ যেমন অন্তরঙ্গ পরিচয়ে উদ্ভাসিত হন, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মতামতও প্রদান করেন।
 

১১ জুন বেলা ১১টায় শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য যখন লালমাটিয়ায় তাঁর ফুফুর বাড়িতে উপস্থিত হলাম, তখন সদ্য স্নাতা শেখ হাসিনা সেদিনের পত্রিকা পড়ছিলেন। বাড়ির ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের তিন–চারটি বড় প্রতিকৃতি। তার পাশে শেখ মনি ও তাঁর স্ত্রীর ছবি। শোকেসে এই শহীদ পরিবারের আরও স্মৃতিচিহ্ন।
 

পিতৃসূত্রে পাওয়া স্বভাবসুলভ পরিচিত হাসিতে, অভ্যর্থনা জানিয়ে শেখ হাসিনা বললেন, ‘সাক্ষাৎকার দেওয়ার মতো মনমানসিকতা নেই। তবু আপনাকে যখন কথা দিয়েছি, সন্ধানীর পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকার দেব। সবার জন্য রইল আমার শুভেচ্ছা।’
সূত্র: প্রথমআলো

Side banner